ঢাকা, আজ মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর ২০২০

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের ‘টাকার পাহাড়’

প্রকাশ: ২০২০-০৬-২৬ ১০:৫৩:৪৪ || আপডেট: ২০২০-০৬-২৬ ১০:৫৩:৪৪

সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে (সুইস ব্যাংক) কোনো কোনো বাংলাদেশি যেন ‘টাকার পাহাড়’ গড়ে তুলেছেন।
২০১৯ সালে বাংলাদেশিদের মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্র্যাংক। স্থানীয় মুদ্রায় ৫ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা (প্রতি সুইস ফ্র্যাংক ৯০ টাকা হিসাবে), যা কমপক্ষে ১২টি বেসরকারি ব্যাংকের (দেশের) পরিশোধিত মূলধনের সমান।null

null

null

২০১৮ সালে এ সঞ্চয় ছিল ৫ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় ১৩২ কোটি টাকা কমেছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। তবে আলোচ্য বছরে দেশটির আমানত কমেছে।
null

null

null
বৃহস্পতিবার সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কোনো বাংলাদেশি যদি তার নাগরিকত্ব গোপন রেখে টাকা জমা করে থাকে, তার তথ্য এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।null

null

null
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগ না হওয়ায় পুঁজি পাচার হচ্ছে। আমানত রাখার ক্ষেত্রে এ বছরও বিশ্বে প্রথম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য। তবে আলোচ্য সময়ে সুইস ব্যাংকে সারা বিশ্বের আমানত বেড়েছে।null

null

null

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, এই আমানতের বিভিন্ন ক্যাটাগরি রয়েছে।
null

null

null
এ ক্ষেত্রে একটি অংশ হল ব্যক্তিগত আমানত। তবে তাও আস্তে আস্তে কমছে। তবে পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিভিন্ন চেষ্টা চলছে। এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার। তবে যেহেতু আমরা এগমন্ট গ্রুপের সদস্য, তাই সেখান থেকে তথ্য পাওয়া যায়। সেভাবেই বিভিন্ন চেষ্টা চলছে।
null

null

null
বাংলাদেশিদের আমানত : ২০১৯ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের স্থিতি ছিল ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্র্যাংক। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে যা ছিল ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৭ সালে ছিল ৪৮ কোটি ১৩ লাখ ফ্র্যাংক।
null

null

null
২০১৬ সালে ৬৬ কোটি ১৯ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৫ সালে ৫৫ কোটি ৮ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৪ সালে যা ছিল ৫০ কোটি ৬০ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৩ সালে ৩৭ কোটি ২০ লাখ ফ্র্যাংক স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। ২০১২ সালে ছিল ২২ কোটি ৯০ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১১ সালে ছিল ১৫ কোটি ২০ লাখ ফ্র্যাংক।

উল্লেখ্য, স্বর্ণালংকার, শিল্পকর্ম এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র সুইস ব্যাংকে জমা রাখা হলে সেগুলো আর্থিক মূল্য হিসাব করে আমানতে যোগ করা হয় না।null

null

null

মোট আমানত : প্রতিবেদন অনুসারে আলোচ্য সময়ে বিশ্বের সব কটি দেশের আমানত বেড়েছে। আলোচ্য বছরে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি ফ্র্যাংক। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি ফ্র্যাংক। এ হিসাবে এক বছরে আমানত বেড়েছে ৩ হাজার কোটি ফ্র্যাংক।null

null

null

২০১৭ সালে ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি ফ্র্যাংক। এ ছাড়া ২০১৬ সালে ছিল ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি ফ্র্যাংক। ২০১৫ সালে সুইস ব্যাংকে বিদেশিদের মোট আমানত ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি ফ্র্যাংক। ২০১৪ সালে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি ফ্র্যাংক।

২০১৩ সালে ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার কোটি, ২০১২ সালে ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি ফ্র্যাংক।
null

null

null
সুইস ব্যাংকে আমানত রাখার দিক থেকে এ বছর প্রথম অবস্থানে যুক্তরাজ্য। ২০১৯ সালে দেশটির আমানতের পরিমাণ ৩৭ হাজার ৬৬০ কোটি ফ্র্যাংক।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৫ হাজার ৯০৮ কোটি, সিঙ্গাপুর ৩ হাজার ৭৩০ কোটি, চীন ১ হাজার ৫০৫ কোটি, রাশিয়া ১ হাজার ৩৮৬ কোটি, সৌদি আরব ৯৭৮ কোটি, থাইল্যান্ড ৪৫০ কোটি, তাইওয়ান ১ হাজার ২২ কোটি, জাপান ২ হাজার ৭২১ কোটি, তুরস্ক ৬৬৯ কোটি, ভিয়েতনাম ৭৫ null

null

nullকোটি, কম্বোডিয়া ২ কোটি এবং মালয়েশিয়া ২৩১ কোটি ফ্র্যাংক। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের আমানত সবচেয়ে বেশি কমেছে। গত বছর দেশটির আমানত ছিল ৭২ কোটি ফ্র্যাংক।

এবার তা কমে ৩৫ কোটিতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ সুইস ব্যাংকে আমানতের দিক থেকে এবার পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। ভারত null

null

nullআগের বছরের চেয়ে ৪ কোটি ফ্র্যাংক কমে ৮৯ কোটি ২০ লাখে নেমে এসেছে। এ ছাড়া নেপাল ১৭ কোটি, আফগানিস্তান ৪ কোটি ৫২ লাখ, ভুটান ১৩ লাখ, শ্রীলংকা ৪ কোটি এবং মিয়ানমারের ৪৭ লাখ ফ্র্যাংক আমানত রয়েছে।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) রিপোর্ট প্রকাশ করাnull

null

null হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০৬-২০১৫ সাল পর্যন্ত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের প্রায় সমান।

একক বছর হিসাবে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ১৫১ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। দেশীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে ৪টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪টি প্রক্রিয়ায় এই অর্থ পাচার হয়েছে। এর মধ্যেnull

null

null রয়েছে বিদেশি পণ্যের আমদানিমূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রফতানিমূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি ও অন্য মাধ্যমে বিদেশে লেনদেন এবং ভিওআইপি ব্যবসা। এ ছাড়া টাকা পাচারে বিশ্বের শীর্ষ ৩০ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের নাম।
null

null

null
সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশই কোনো-না-কোনোভাবেই পাচার হচ্ছে। টাকা পাচারের তথ্য এসেছে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপির রিপোর্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজে প্রকাশিত পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসে।null

null

null

সূত্র বলছে, দুর্নীতি ও চোরাচালানের মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে। ওইসব টাকায় দুর্নীতিবাজরা বিদেশে সম্পদ গড়ে তুলছেন, জমা রাখছেন বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। এর বাইরে আরও অনেক ব্যাংকে বাংলাদেশের পাচারকারীদের টাকা রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগে মালয়েশিয়া সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, বিদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ান সরকারের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে null

null

nullবাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী।

দেশ থেকে বিদেশে কোনো টাকা নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগে। কিন্তু এ পর্যন্ত কাউকে ব্যাংক থেকে এই ধরনের কোনো অনুমোদন দেয়া
হয়নি। তারপরও বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় কীভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ হল। কানাডায় রয়েছে বাংলাদেশি অধ্যুষিত অঞ্চল বেগম পাড়া।null

null

null
এ ছাড়া ব্রিটেন, হংকং, সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকেও বাংলাদেশিদের টাকা রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

টাকা পাচার বলার কারণ : সুইস ব্যাংক মূলত তাদের প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা বিদেশিদের আমানতের তথ্য প্রকাশ করে।
কিন্তু বাংলাদেশি আইনে কোনো নাগরিকের বিদেশি ব্যাংকে আমানত রাখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত কাউকে বিদেশে টাকা জমা রাখার বিশেষ অনুমোদনও দেয়া হয়নি। এ ছাড়া কোনো প্রবাসীও সরকারকে জানাননি যে, তিনি সুইস ব্যাংকে টাকা জমা রেখেছেন। ফলে সূত্র বলছে, সুইস ব্যাংকে জমা পুরো টাকাটাই দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে।null

null

null
সুদীর্ঘ সময় ধনীদের অর্থ গোপনে জমা রাখার জন্য খ্যাত সুইজারল্যান্ড। দেশটিতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২৪৬টি ব্যাংক রয়েছে। বিশ্বের বড় বড় ধনী অর্থ পাচার করে দেশটিতে জমা রাখে। ব্যাংকগুলোও কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে। আগে সুইস ব্যাংকে জমা টাকার কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হতো না। এমনকি আমানতকারীর নাম-ঠিকানাও গোপন রাখা হতো। একটি কোড নম্বরের ভিত্তিতে টাকা জমা রাখা হতো। কিন্তু null

null

null২০০২ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী টাকা পাচার রোধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ব্যাপকভাবে কার্যকর করা হয়। এরপর আন্তর্জাতিক চাপে সুইস ব্যাংক জমা টাকার তথ্য প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়।
ফলে তারা ওই সময় থেকে বিভিন্ন দেশের জমা টাকার তথ্য প্রকাশ করছে। ওই প্রতিবেদনে কোন দেশের কত টাকা জমা আছে, সে তথ্য তারা প্রকাশ করছে। আমানতকারীদের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করছে না। ফলে পাচারকারীদের ঠেকানো যাচ্ছে না।null

null

null

সুইস ব্যাংক পরিচিতি : সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) হল সুইজারল্যান্ড সরকারের স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ আইন দ্বারা পরিচালিত এই ব্যাংকটির নীতিনির্ধারণ সবই স্বাধীন।
২শ’ বছরের পুরনো ইউরোপের এ প্রতিষ্ঠানটি মুদ্রা পাচারকারীদের নিরাপদ স্বর্গ। ১৮৯১ সালে সুইজারল্যান্ড সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত একটি ধারার অধীন ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। এরপর থেকে ব্যাংকটির মুদ্রানীতি এবং সুশৃঙ্খল কার্যক্রম বিশ্বের উন্নত দেশগুলো অনুসরণ করে। তবে পাচারকারীদের আশ্রয়দাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে দেশটির পরিচিতি রয়েছে।null

null

null
ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২০০২ সাল থেকে দেশভিত্তিক আমানতকারীদের তথ্য প্রচার শুরু করেছে তারা। যেসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি রয়েছে, সেসব দেশের ব্যক্তিগত পর্যায়ে তথ্য দেয়া হয়। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশিদের আমানত কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সুযোগ থাকলেও তা ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশিরা এখনও সুইস ব্যাংককে পাচার করা টাকা রাখার নিরাপদ স্থান হিসেবে মনে করে।