ঢাকা, আজ রোববার, ১ নভেম্বর ২০২০

অভাবকে খুব কাছ থেকে দেখেছি :বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন বিসিএস ক্যাডার লিজা

প্রকাশ: ২০২০-০৫-১৪ ১১:১৯:২৫ || আপডেট: ২০২০-০৫-১৪ ১১:১৯:২৫

রওশনা জাহান লিজা ৩৭তম বিসিএস প্রশাসনে সুপারিশপ্রাপ্ত। তার মেধাক্রম ৫৭। নিজের পরিশ্রম ও ইচ্ছাশক্তির ফলে এতদূর এসেছেন। যেতে চান বহুদূর। তার এ অগ্রযাত্রার গল্প শুনিয়েছেন । আপনার শৈশবের গল্প শুনতে চাই– রওশনা জাহান লিজা: আমি মো. আবুল কাশেম ও মোছা. ছালেহা বেগমের দ্বিতীয় এবং ছোট সন্তান। আমার বাবা হোমিও ডাক্তার, মা গৃহিনী। বড় ভাই রহমতুল্লাহ্ আল-আমিন বাংলাদেশ রেলওয়েতে কর্মরত। আমার ছেলেবেলা, স্কুল ও কলেজ জীবন কেটেছে মাথাভাঙা তীরবর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলা সদরের পলাশ পাড়ায়। বাবা নৌবাহিনীতে চাকরি করতেন। কিন্তু তার খামখেয়ালিপনা ও শৌখিনতার কারণে চাকরিটা নিয়মিত করতে পারেননি। পরবর্তীতে রেলওয়ে স্টেশন মাস্টারের চাকরিতেও যোগদান না করে হোমিওপ্যাথি চর্চা ও বই পড়ায় মনোনিবেশ করেন। যে কারণে ছোটবেলা থেকেই অভাব-অনটনে দিনাতিপাত করতে হয়েছে। তবে বাবার এ খামখেয়ালিপনা আমাকে কঠোর পরিশ্রমী, আত্মপ্রত্যয়ী, চ্যালেঞ্জ গ্রহণসহ তা মোকাবেলা করা শিখিয়েছে। বাবাই আমার সব সংগ্রামে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন এবং আছেন। আমার মা কখনো নিজের সুখ ও শৌখিনতার দিকে না তাকিয়ে আমাদের দু’ভাইবোনকে মানুষ করার পেছনে নিজেকে

উৎসর্গ করেছেন। তবে বাবার কাছ থেকে পেয়েছি উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রেরণা। আমার এখনও মনে পড়ে- আমাদের দুঃখের সময় বাবা আমাকে বলতেন, ‘Prosperity and adversity comes by turn’. যেটা আমার জীবনে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়েছে। আরও মনে পড়ে- বাবার সাথে ছেলেবেলায় কাটানো দিনগুলো। বাবার হাত ধরে মাথাভাঙা নদীতে সাঁতার কাটতে যেতাম। বাবার কাছেই সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। এ সময় পর্যন্ত কোন প্রাইভেট টিউটরের কাছে যাইনি। বাবাকে বড্ড ভয়ও পেতাম। একটা ভয়ের ঘটনা বলি- স্কুলে পড়াকালীন বাবা আমার বার্ষিক পরীক্ষার প্রত্যেকটি পরীক্ষার প্রশ্ন মুখে মুখে ধরতেন। তাই আমি পরীক্ষায় যে প্রশ্নটি না পারতাম; সেটা পরীক্ষা শেষে স্কুলে পড়ে নিয়ে বাড়ি আসতাম। শৈশবের গল্প শুনে মনে হচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে আরও কোন অ্যাডভেঞ্চার অপেক্ষা করছে– রওশনা জাহান লিজা: প্রথমেই বলেছি- অভাবকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। অভাবের কারণে বাড়ির পাশের কিন্ডারগার্টেন স্কুল থাকলেও পড়তে হয়েছে দূরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমি যখন ঝিনুক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ি; তখন খাতা কেনার অভাবে মা আমাকে ক্যালেন্ডার দিয়ে খাতা বানিয়ে দিতেন। আমি তার পেছনের পাতায়

লিখতাম। এমনকি পরিচিতজন ও আত্মীয়ের পুরনো বই পড়ে স্কুল জীবন শেষ করেছি। অষ্টম শ্রেণিতে অর্ধবেতনে ইংরেজি ও গণিত পড়ার সুযোগ পাই শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রয়াত ফারুক আহমেদ ও শফিকুল ইসলাম জিন্নাহ স্যারের কাছে। এজন্য আমি স্যারদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। এ সময় থেকে আমার নিজেরও টিউশন জীবনের হাতেখড়ি, যা আমাকে স্কুল ও কলেজ জীবন শেষ করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। জীবনে প্রথম সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি নবম শ্রেণিতে ওঠার সময়। বাবা ও শিক্ষকরা চেয়েছিলেন আমি যেন বিজ্ঞানে পড়ালেখা করি। কিন্তু আমার একমনে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অন্যমন আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় অর্থনৈতিক চিন্তার কথা। বিজ্ঞানে বেশি প্রাইভেট পড়তে হবে বলে আমি মানবিকে ভর্তি হই। আর তখনই আমি সিদ্ধান্ত নেই- মানবিক থেকে জীবনে ভালো কিছু করবো এবং স্বপ্ন দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়ার। পরবর্তীতে চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৬ সালে মানবিক বিভাগে আমার নিজ স্কুল এবং জেলা সদর থেকে আমিই প্রথম জিপিএ ৫ পেয়ে পত্রিকায় নাম উঠাতে সক্ষম হয়েছিলাম। এরপর আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আমি বোর্ড বৃত্তি, জেলা পরিষদ বৃত্তি, জেলা প্রশাসকের অনুদান এবং আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় ২০০৮ সালে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করি। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখন; যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির

উদ্দেশে ঢাকা শহরে কোচিংয়ের জন্য আসি। ঢাকায় কোচিংয়ে ভর্তি করানোর জন্য পরিবারের অর্থনৈতিক সামর্থ ছিল না। কিন্তু জেদ ধরাতে বাবা জমি বন্ধক রেখে টাকা দেন কোচিংয়ে ভর্তি হতে। এরপর ঢাকা শহরে প্রথম আসাতে এখানকার আবহাওয়া মানিয়ে নিতে না পারায় টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হই। বাড়িতে ফিরে যখন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছিলাম; তখন আমার এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। আমি জিপিএ ৪.৯০ পেয়ে চরমভাবে ভেঙে পড়ি। ফলাফল কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। তবে এ ভাঙামন আমাকে নতুনভাবে তাড়না দেয় এবং মনে দৃঢ়তা এনে দেয়। আমি তিনদিন পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরি, তখন কেবল কোন রকম দাঁড়াতে পারি। পরদিনই ঢাকা ফিরে আসি। আমার শিক্ষা জীবনে রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, অসুস্থতা কখনও আমার উপস্থিতিকে দমাতে পারেনি। এরপর আমি প্রথমবারেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই। আপনার সংগ্রামের গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হচ্ছি। আপনার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কিন্তু এরপর কেমন কেটেছে উচ্চশিক্ষার সময়গুলো? রওশনা জাহান লিজা: বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় থেকেই কঠিনতম সংগ্রামে প্রবেশ করি। ভর্তির পর হলের

বাইরে থেকে লেখাপড়া নিয়মিত করা বেশ কঠিন ছিল। তবে এ যাত্রায় বিশ্ববিদ্যালয় ও এলাকার বড় ভাই সোহাগ ভাইয়ের সাহায্যে শুরুতেই রোকেয়া হলে উঠি। কিন্তু প্রথম বর্ষে কোন টিউশন না পাওয়ায় গ্রামীণ ব্যাংকের শিক্ষা ঋণের শরণাপন্ন হই। এখনও আমার ৫০ হাজার টাকা শিক্ষা ঋণ অপরিশোধিত রয়েছে। যা এখন আমার পরিবার পরিশোধ করতে সক্ষম। কিন্তু আমার একান্ত ইচ্ছা আমি চাকরি জীবন শুরু করে নিজে এটা পরিশোধ করবো। এজন্য আমি গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। কিছুদিনের মধ্যেই একটি টিউশনের ব্যবস্থা হয় মালিবাগে। একটা টিউশনে বই কেনা, লেখাপড়া, খাওয়া খরচসহ অন্যান্য খরচ চালানো কষ্টকর ছিল। এজন্য আমি পায়ে হেঁটে রোকেয়া হল থেকে মালিবাগ আসা-যাওয়া করতাম। তবে এ কষ্ট আমার তেমন কষ্টকর মনে হতো না। কষ্ট হয়েছিল তখন; যখন নভেম্বর-ডিসেম্বরে বাচ্চাদের পরীক্ষা শেষ হলে টিউশন বন্ধ থাকতো। কষ্টের কথা বলি- একবার বছর শেষে টিউশন না থাকায় শীতের ছুটিতে বাড়ি যাই। কিন্তু ছুটি শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরতে পারছিলাম না। ছিল না বাস ভাড়ার

টাকা। তখন টিউশন মিডিয়ার বাবু ভাইয়ের কাছে ফোন করে খুব কেঁদেছিলাম। তিনি তখন ২টি টিউশনের ব্যবস্থা করে দেন। এরপর থেকে আমার আর কখনো টিউশনির অভাব হয়নি। আমি একজন মেয়ে হয়ে ঢাকার বুকে দুপুর ২টা থেকে একটানা রাত ৮টা পর্যন্ত মিরপুর, মালিবাগ, মগবাজার, জাহাঙ্গীর গেট টিউশনি করেছি। অন্যদেরকেও টিউশন দিয়ে সাহায্য করেছি। এ ব্যস্ততার ফাঁকে সময় পেলে রোকেয়া হল রেঞ্জার ইউনিটে ও পথশিশুদের নিয়ে কাজ করতাম। কিছু কথা বলতেই হয়- আমার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কিছু বন্ধু ছিলো, যারা সবসময় আমার বিপদে পাশে থেকেছে। নিজেকে অনেক ভাগ্যবতী মনে করি। আমার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের কাছ থেকে সামাজিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হইনি। তারা আমাকে সেই পরিবেশ দিয়েছে; যেখানে ছেলে-মেয়ে কোন ভেদাভেদ ছিল না। দাম্পত্য জীবন, পোস্ট গ্রাজুয়েশন এবং বিসিএস যাত্রা সম্পর্কে কিছু বলুন– রওশনা জাহান লিজা: জীবনের সাথে সংগ্রাম করতে করতে সিদ্ধান্ত নিলাম কারো ওপর নির্ভরশীল হওয়ার। জীবনের বাকি স্বপ্নগুলো একসঙ্গে পূরণ করার। সুন্দর মনের একজনকে পেয়েও গেলাম। নিজের ইচ্ছা ও পরিবারের সম্মতিতে আমরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলাম।

এরপর এমএ ভর্তির পর আমার শরীরে নতুন প্রাণের অস্তিত্ব টের পেলাম। তারপর অর্থনৈতিক সংগ্রামকে পেছনে ফেলে শুরু হলো নতুন সংগ্রাম। আমার তখন একমাত্র লক্ষ্য- যেভাবেই হোক এমএ শেষ করবো এবং একটি সুস্থ বাচ্চার জন্ম দেবো। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো তখনই; যখন শুনলাম আমার ফাইনাল পরীক্ষার তারিখ ও ডেলিভারির তারিখ একই সময়ে। তখন আমি ভাবতাম, মিরপুর ১৪ থেকে বাসে নিয়মিত ৬-৮ ঘণ্টা ক্লাস করার কথা। মনে হতো এত কষ্ট করে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পরও কি আমি পরীক্ষার হলে বসতে পারবো না! এত এত উদ্বিগ্নতায় আমার প্রেগন্যান্সির শেষ দিকে আমার হিমোগ্লোবিন নেমে আসে ৬.৫ এ। এটা ডেলিভারি ডেটের ঠিক ১৫ দিন আগে। মিরপুরে যেখানে ডাক্তার দেখাতাম, তারা রিস্ক নিতে রাজি হলেন না। পরামর্শ দিলেন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা করানোর জন্য। ইতোমধ্যে ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। আমি পরীক্ষা দিচ্ছি আর ধানমন্ডিতে ডিএমসির কনসালটেন্টের পরামর্শে প্রতিটি পরীক্ষার শেষে হাসপাতাল থেকে হয় ব্লাড নতুবা হিমোগ্লোবিন বাড়ানোর ইঞ্জেকশন নিয়ে

বাসায় ফিরতাম রাত ৯-১০টার সময়। ব্লাড নেওয়ার মধ্যে চরমভাবে অসুস্থও হই। যা হোক, আমি আমার ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের কাছে কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে পরীক্ষার হলের পেছন দিকে বসার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেখানে আমি কখনও বসে, কখনও দাঁড়িয়ে, কখনও বা হেঁটে পরীক্ষা শেষ করেছি। শেষ পরীক্ষার দিন বিশেষ অনুমতিক্রমে ভাইভা দিয়ে এমএ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করেছি। আল্লাহর অশেষ রহমতে ভাইভার পরদিন সি সেকশনে আমার একটি মেয়ে হলো। এরপর শুরু হয় স্বপ্নকে ছোঁয়ার লড়াই। যখন প্রথম ৩৫তম বিসিএস পাই, তখন মেয়ের বয়স মাত্র ৪ মাস। আবেদন করেও প্রস্তুতি না থাকায় পরীক্ষা দেইনি। ৩৬তম বিসিএসের সময়ও মেয়েকে সময় দিতে গিয়ে পড়ার সুযোগ মেলেনি। যথারীতি এটাও মিস করলাম। অবশেষে স্বামী মো. নজরুল ইসলামের অনুপ্রেরণা, পরামর্শ ও সহযোগিতায় আমার মা-বাবাকে নিজের কাছে নিয়ে আসলাম। এ সময়ে প্রাইভেট চাকরিতে যোগদানের সুযোগ ছিল। কিন্তু স্বামী আমাকে বলেছেন, ‘এ চাকরি করার দরকার নেই। আগে ভালো কিছুর চেষ্টা করো। তারপর

না হলে করবে।’ এরপর শুরু হলো ৩৭তম বিসিএস প্রস্তুতি। এমনভাবে নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম যে, সুযোগ পেয়েছি একটাই। সুতরাং কোন ত্রুটি রাখা যাবে না। দিন-রাত পড়াশোনা করতাম। মেয়েকে মায়ের কাছে নিশ্চিন্তে রেখে সকাল ১১টায় কোচিংয়ের লাইব্রেরিতে চলে যেতাম। ফিরতাম রাত ৯টায়। এরপরের সময়টুকু মেয়ের জন্য বরাদ্দ রেখে আবার রাত ১২টা থেকে ৩-৪টা পর্যন্ত পড়তাম। একটানা এত পড়া জীবনে কখনো পড়িনি। বলা যায়, লেখাপড়ার প্রতি একপ্রকার আসক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। এমন সময় পার করছিলাম যে, স্বামীর সাথে একই বাসায় থেকেও সপ্তাহে দু’একদিন দেখা হতো শুধু সময়ের অভাবে। মাঝে মাঝে খুব হতাশ লাগতো এই ভেবে যে, কী জীবন পার করছি! তখন স্বামী বোঝাতো, ‘আর কিছুদিন কষ্ট করো। এরপর তো শুধু তুমি আর আমি আর আমাদের বাস্তবায়িত স্বপ্ন।’ এ সময়ে মায়ের সহায়তার কথা কী-ই বা বলবো! মা ছাড়া আমার সব অর্জন নস্যি। অবশেষে স্রষ্টার অশেষ কৃপায় প্রথম প্রস্তুতিতেই প্রথম চাকরির প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং ভাইভা উত্তীর্ণ হয়ে ৩৭তম বিসিএস এ প্রশাসনে ৫৭তম

অবস্থান নিয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। জীবনের এতো এতো সংগ্রামের পর সফলতা পেলেন। সেই সফলতার উপলব্ধি ও ইচ্ছা সম্পর্কে কিছু বলুন– রওশনা জাহান লিজা: ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম, সাহস, প্রচেষ্টা আর একাগ্রতা যে কোন বাধাকে দূরে ঠেলে দেয় এবং সফলতার দিকে ধাবিত করে। ছোট ছোট সফলতাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিলে আরও অনেক বড় সফলতা পাওয়া যায়। ব্যর্থতাকে শক্তি হিসেবে নিলে নতুনভাবে সফল হওয়া যায়। ইচ্ছাশক্তি, স্রষ্টার অনুগ্রহ এবং চেষ্টায় সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে সফলতা সহজে ধরা দেয়। পৃথিবী অনেক প্রতিযোগিতাপূর্ণ, সে নিজে থেকে কাউকে জায়গা দেয় না, চেষ্টা ও পরিশ্রম দ্বারা নিজের জায়গা করে নিতে হয়। আর আমার পরবর্তী ইচ্ছা এই যে, আমি সেই সব ছেলে-মেয়েদের জন্য কিছু করতে চাই। যাদের প্রবল ইচ্ছা ও চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বাধার কারণে পিছিয়ে পড়ে থাকে। তাছাড়া পরিবার, দেশমাতৃকা আমাকে যে অকৃপণ দানে ঋণী করেছে। নিজের জীবন উৎসর্গ করে হলেও তাদের কিছুটা ঋণ শোধ করতে চাই। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন, আমি যেন আগের সফলতার ন্যায় তা সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারি।

বাবা সিকিউরিটি গার্ড, মা কাজের বুয়া ছেলে এখন জজ!

সংসার চালাতে কিছুদিন আগেও রাজধানীর উত্তরায় একটি বাড়িতে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করছিলেন মোশারফ হোসেন। তার স্ত্রী’ মাহফুজা খাতুন এলাকার অনেকের বাড়িতে করেছেন বুয়ার কাজ। বাবা-মায়ের ক’ষ্টে উপার্জিত সেই টাকায় পড়ালেখা করে তাদের বড় সন্তান গোলাম রসুল সুইট এখন সহকারী জজ। ১২তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে ৬৭তম হয়েছেন তিনি। ১৯ জানুয়ারি ঘোষিত গেজেটে তালিকা প্রকাশ করা হয়। আগামী মঙ্গলবার (২৮ জানুয়ারি) সহকারী জজ হিসেবে পিরোজপুর জে’লায় যোগদান করবেন তিনি। সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজে’লার পারুলিয়া ইউনিয়নের কোম’রপুর গ্রামের বাবা মোশারফ হোসেন ও মা মাহফুজা খাতুনের বড় ছেলে গোলাম রসুল সুইট। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী সুইট। পরিবারের অভাবও দমাতে পারেনি তাকে। ঠিকমতো খেতে না পারা সেই গোলাম রসুল সুইট এখন জজ। জাগো নিউজের সঙ্গে নিজের পরিবার ও লেখাপড়া নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন সহকারী জজ গোলাম রসুল সুইট। তিনি বলেন, শাখরা কোম’রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভোম’রা ইউনিয়ন দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল পাস করেছি। এরপর দেবহাটা

উপজে’লার সখিপুর খানবাহাদুর আহসানউল্লাহ্ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। আমাদের পরিবারে তখন খুব অভাব। বাবাও ছিলেন উদাসীন। কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে দিন চলতো আমাদের। সুইট আরও বলেন, কলেজ শেষ করার পর লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এমন সময় সাতক্ষীরা শিল্পকলা একাডেমিতে একটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করি। সেখান থেকে এক ভাই আমাকে পরাম’র্শ দেয় ঢাকায় গিয়ে কোচিং করার। কিন্তু পরিবারের সেই অবস্থা ছিল না। মায়ের একটি গরু ছিল। সেই গরুটি ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে ২০১০ সালের ১৭ মে ঢাকা যাই। এরপর একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হই। তিনি বলেন, কিছুদিন পর মায়ের গরু বিক্রি করা সেই টাকাও ফুরিয়ে যায়। বাড়িতেও টাকা চাওয়া বা পরিবারে দেয়ার মতো কোনো অবস্থা ছিল না। কা’ন্নাকাটি করেছিলাম কোচিং পরিচালকের সামনে। এরপর তিনি আমাকে

সেখানে বিনামূল্যে কোচিং ও থাকার ব্যবস্থা করেন। এরই মধ্যে সঙ্গে থাকা সহপাঠীদের বন্ধু হয়ে যাই আমি। বন্ধুরাও আমা’র পারিবারিক অবস্থা জানার পর আমাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতে থাকে। বন্ধুদের সহযোগিতার কথাগুলো ভুলে যাওয়ার নয়। মা ও বাবা মাঝে মধ্যে এক হাজার বা দুই হাজার করে টাকা দিত। গত এক মাস আগে বাবাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছি। সিকিউরিটি গার্ডের চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে। মাকেও এক বছর আগে অন্যের বাড়িতে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছি। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার গল্প জানিয়ে গোলাম রসুল সুইট বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দেই। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তির সুযোগ হয়। বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরাম’র্শে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হই। ভর্তির পর টিউশুনির পোস্টার ছাপিয়ে অ’ভিভাবকদের কাছে

বিতরণ শুরু করি। এভাবে পাঁটি টিউশুনি জোগাড় হয়ে যায়। এভাবেই চলেছে আমা’র শিক্ষাজীবন। আত্মীয়-স্বজনরা কখনও খোঁজ নেয়নি; তবে আমা’র বন্ধুরা আমা’র পাশে থেকেছে সব সময়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের ফলাফলে বি-ইউনিটে মেধাতালিকায় হয়েছি ১১তম। ১২তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে হয়েছি ৬৭তম। ১০০ জন উত্তীর্ণ হয়েছিল। এর মধ্যে নিয়োগ হয়েছে ৯৭ জনের। তিনজন পু’লিশ ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন। আগামী মঙ্গলবার পিরোজপুর জে’লার সহকারী জজ হিসেবে যোগদান করবো জানিয়ে তিনি বলেন, আমা’র বড় লোক হওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই। সব সময় ন্যায়ের পথে থেকে মানুষের জন্য কাজ করে যাব। কখনও অনিয়ম বা দু’র্নীতির সঙ্গে জ’ড়িত হবো না। যখন চাকরিজীবন শেষ করবো তখন যেন অ’বৈধ উপায়ে উপার্জনের একটি টাকাও আমা’র ব্যাংক একাউন্টে না থাকে। আমা’র কাছে সব মানুষ ন্যায়বিচার পাবে।

অসহায় মানুষরা কখনই ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে না। দুস্থ পরিবারের সমস্যাগুলো আমি বুঝি, জানিয়ে গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে গোলাম রসুল সুইট বলেন, টাকা-পয়সা লেখাপড়ার পথে কোনো বাধা নয়। ইচ্ছাশক্তি থাকলে সে এগিয়ে যাবেই, পথ বেরিয়ে যাবেই। সুইটের বাবা মোশারফ হোসেন জানান, রাজধানীর উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরে আট বছর সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করেছি। আম’রা স্বামী-স্ত্রী’ দুজনই থাকতাম। স্ত্রী’ অন্যের বাড়িতে কাজ করতো। এক মাস আগে ছেলে চাকরিটা ছেড়ে দিতে বলেছে। তাই চাকরি ছেড়ে বাড়িতে চলে এসেছি। ছেলে বলেছে, আমি এখন চাকরি পেয়েছি আপনার কাজ করতে হবে না। ভাবছি, এলাকায় ছোট একটি দোকান দিয়ে ব্যবসা করবো। অন্যের বাড়িতে কাজের বুয়া থাকাকালীন সময়ে সেসব কথা মনে করে কেঁদে ওঠেন মা মাহফুজা খাতুন। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, মানুষের বাড়িতে কাজ করতাম। স্বামী

আর আমা’র টাকা দিয়েই চলতো সংসার আর দুই ছেলের খরচ। আম’রা যেটুকু পেরেছি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি ছেলের লেখাপড়া করানোর জন্য। দোয়া করেছি। আল্লাহ্ আমাদের ডাক শুনেছেন। দোয়া কবুল করেছেন। আমি অনেক খুশি। এখন সব মানুষের কাছে আমা’র ছেলের জন্য দোয়া চাই। গোলাম রসুল সুইটের বাল্যবন্ধু জাবিরুল ইস’লাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই শান্ত ও মেধাবী ছিল রসুল। আম’রা একসঙ্গেই লেখাপড়া করতাম। কখনও কারও সঙ্গে সে জো’র গলায় কথা বলেছে, আমাদের জানা নেই। দেবহাটার পারুলিয়ার ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, খুব অভাবি ছিল তাদের পরিবার। জমি জায়গা কিছুই নেই। মা-বাবা খুব ক’ষ্ট করে ছেলেটাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। ছেলেটাও খুব ভালো। জজের চাকরি পেয়েছে। এতে এলাকার সব মানুষ খুশি হয়েছে।

পরিশ্রমী ব্যক্তি কখনও ব্যর্থ হয়না, কোন না কোন রাস্তা তার জন্য খুলে যায়ঃ জ্যাক মা

জ্যাক মা বা মা ইয়ান একজন চাইনিজ উদ্যোক্তা। জনপ্রিয় ই-কমার্স সাইট আলিবাবা ডট কমের ফাউন্ডার। হাজার হাজার তরুন উদ্যোক্তাদের আইডল। ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বের ২৬ তম ধনী ব্যক্তি তিনি। তার বর্তমান সম্পদের পরিমান ২৭ বিলিয়ন ডলার এর উপর। পরিশ্রমকারী ব্যক্তি কখনও ব্যর্থ হয়না, কোন না কোন রাস্তা তার জন্য খুলে যায় একদিন। বিল গেটস থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যক্তিরা আজকের এ অবস্থানে আসতে পেরেছেন, শুধুমাত্র নিজেদের পরিশ্রমের কারনে।জনপ্রিয় ট্রেডিং সাইট Alibaba.Com এর কর্ণধার এবং চীনা কোটিপতি জ্যাক মার গল্পটাও সেরকম। জ্যাক মাকে না চিনলেও Alibaba.Com চিনেনা, এরকম মানুষ কম পাওয়া যাবে। এ জ্যাক মা এখনকার অবস্থানে কখনও ছিলেননা। উনার আজকের এ উথ্থানটাই হয়েছে Alibaba.Com এর মাধ্যমে। যখন উনি এ ওয়েবসাইট নিয়ে ভাবেন, তখন

চীনের ইন্টারনেট এত বেশি ব্যবহৃত হত না। সেই দেশে বসে এধরনের ওয়েবসাইটের কল্পনা করাটাও আসলে তখন অনেক রিস্কের ছিল। জ্যাক মা যুব সমাজের জন্য, যারা নিজেরা কিছু একটা করে দেখাতে চায়, তাদের জন্য কয়েকটি উক্তি করেন – আপনার দরিদ্র হয়ে জন্মানোটা দোষের না কিন্তু দরিদ্র হয়ে থাকাটাই দোষের। আপনি যদি একটি দরিদ্র ঘরে জন্ম নিয়ে নিজের ৩৫ বছর বয়সেও সেই দরিদ্রই থাকেন তবে দরিদ্র হয়ে থাকাটা আপনার কপালের দোষ নয়, আপনি এটি প্রত্যাশা করেন। কারন আপনি আপনার যুবক বয়সকে কোন কাজে লাগাতে পারেন নি, আপনি সম্পূর্ণ ভাবে সময়টা নষ্ট করে দিয়েছেন। জীবনে অনেক উপরে উঠতে হলে ২৫ বছর থেকেই শুরু করুন, নিজে পরিকল্পনা করুন, তাই করুন যা আপনি উপভোগ করতে জানেন। এগিয়ে যাও তা না হলে ঘরে ফিরে যাও। গরীব কারণ আপনার দূরদর্শিতার অভাব। আপনার দারিদ্রতা কারণ আপনি আপনার ভীরুতাকে জয় করতে পারেন নি। গরীব কারণ আপনি আপনার সর্বোচ্চ ক্ষমতা, ব্যবহার করতে পারেন নি। আপনি দরিদ্র তাই সবাই আফসোস করবে কেউই

আপনাকে সচ্ছল বানিয়ে দিবেনা। যখন আপনার বাবা মায়ের চিকিৎসা ব্যয় আপনি মিটাতে পারবেন না কেউই আপনাকে তা দিবেন না। নিজের জন্য নিজেকেই এগিয়ে আসতে হবে। চিন্তা করতে হবে, ভাবনার সাথে প্রয়গিক বাস্তবতার সন্নিবেসন ঘটাতে হবে। জ্যাক মা আরো বলেন, অনেকেই হতাশ হয়ে যায় যখন আমাদের টাকা থাকে তখন আমরা ভুল করা শুরু করি। তুমি যদি হাল ছেড়ে না দাও তবে এখনো তোমার সুযোগ আছে। হাল ছেড়ে দেওয়াটাই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। কখনো কোনদিন সরকারের সাথে ব্যবসা করো না। তাদের সাথে ভালোবাসা রেখো কিন্তু বিয়ে করো না। আমি নিজেকে সবসময় আনন্দিত রাখতে চেষ্টা করি। কারণ আমি জানি যদি আমি খুশি না থাকি তবে আমার সহকর্মী,অংশীদার ও ক্রেতারাও খুশি থাকবে না। সুযোগ সেখানেই নিহিত যেখানে অভিযোগ আছে