ঢাকা, আজ সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

করোনাভাইরাস: ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ২০২০-০৫-০৫ ২০:২৪:০০ || আপডেট: ২০২০-০৫-০৫ ২০:২৪:০০

দেশে করোনাভাইরাসের হটস্পট হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জে প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে মারা গেছে ৫০ জন। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা।

করোনার ক্লাস্টার এলাকা নারায়ণগঞ্জে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে শিল্প-কারখানা খুলে দেয়ার ঘোষণার পর থেকে নারায়ণগঞ্জে কার্যত লকডাউন বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

কয়েক লাখ শ্রমিকের কলরবে মুখর হয়ে উঠেছে শিল্পাঞ্চলখ্যাত নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, কাঁচপুর এলাকা। শ্রমিকদের কাজে যোগদানের কারণে এসব এলাকায় খুলে গেছে মুদি দোকান থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব দোকানপাট।

একই সঙ্গে সোমবার মার্কেট খোলার সিদ্ধান্ত আসার পরপরই নারায়ণগঞ্জের কয়েক হাজার রেডিমেড পোশাক কারখানা, হোসিয়ারি কারখানাসহ ছোট ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

তাছাড়া লকডাউনের মধ্যেই নারায়ণগঞ্জে আটা-ময়দা, তেল, ডাল, লবণসহ নিত্যভোজ্য ও খাদ্যসামগ্রীর ৪ শতাধিক ফ্যাক্টরি খোলা ছিল, যেগুলো এখনও চলছে। ফলে কর্মের তাগিদে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামছেন।

সোমবার সরেজমিন শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শহরের বিভিন্ন স্থানে খুলতে শুরু করেছে মার্কেটগুলো। সেখানে ক্রেতা কম থাকলেও বিক্রেতারা উপস্থিত। সড়কে সড়কে ইফতারি নিয়ে বসেছে দোকানিরা।

আছে ভ্রাম্যমাণ হকার। খুলেছে ২৪৭টি শিল্প প্রতিষ্ঠান। বন্ধ ঘোষিত সরকারি ঘাটগুলোতে পুলিশ প্রহরা থাকলেও ঘাটের ১০ গজ দূরেই অস্থায়ী ঘাট বানিয়ে পারাপার হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ।

১০ জন ধারণ ক্ষমতার ১টি নৌকায় পারাপার হচ্ছেন কমপক্ষে ৫০ জন। ফতুল্লার বিসিক ও সিদ্ধিরগঞ্জের ইপিজেড এলাকায় গিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের বাড়ি ফেরতের ও কর্মস্থলে যোগদানের দৃশ্য দেখলে বোঝার উপায় নেই নারায়ণগঞ্জে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে ২ দিন আগেই।

এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, সত্যি কথাটা অনেক সময় বললেও বিপদ। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি দেখে অন্তত এটা বলা যায়, গুচ্ছ সংক্রমণ বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরুর খারাপ সময়ে শিল্প-কারাখানা খোলার মানে হচ্ছে আÍঘাতী।

চলতি মাসে যদি নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা দ্বিগুণ করা যায় তবে এর ভয়াবহতা আর বর্ণনা করতে হবে না। এ ব্যাপারে জেলার সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী আবদুল সালাম জানান, মাত্র ১টি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির ন্যূনতম ৫শ’ শ্রমিককে করোনা টেস্ট করানো হোক।অভাবের কারণে নবজাতক সন্তান বিক্রি করতে চেয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার আষাঢ়ীয়ারচর গ্রামে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাসরত বাবুর্চি সাইফুল ইসলামের স্ত্রী মনি বেগম।

করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে অভাব-অনটনে ও ধার-দেনা পরিশোধ করতে হতদরিদ্র তিনি সদ্যভূমিষ্ট কন্যা সন্তানকে অল্প টাকায় বিক্রি করে দেয়ার চেষ্টা করেন। সোমবার তিনি ওই কন্যা সন্তানের জন্ম দেন।

খবর পেয়ে মঙ্গলবার দুপুরে সোনারগাঁও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুম ওই মা ও পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন।

তাৎক্ষণিক ৬নং ওয়ার্ডের সদস্য আলমগীর কবির ও সোনারগাঁও উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফ আহম্মেদের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান প্রেরণ করেন চেয়ারম্যান মাসুম।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গর্ভবতী অবস্থায় তাকে ফেলে চলে গেছে তার স্বামী বাবুর্চি সাইফুল ইসলাম। ৩ সন্তানকে বুকে ধরে একটি কারখানার ম্যাচে রান্নাবান্নার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল মনি বেগম। করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে কারখানার উৎপাদন এখন বন্ধ। এ কারণে লোক না থাকায় ম্যাচের রান্নাবান্নার কাজও বন্ধ। এরই মধ্যে গত সোমবার অন্তঃসত্ত্বা মনি বেগমকে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে সে একটি কন্যা সন্তান জন্ম দেয়।

বাড়ির মালিক জুয়েল মিয়া জানান, আর্থিক অনটনের কারণে আরও ২ মাস আগে থেকে আমরা ওই অসহায় পরিবারের বাড়ি ভাড়া নেয়া বন্ধ করে দিয়েছি। অভাবে নিজের সন্তান বিক্রির চেষ্টার বিষয়টি আমরা পরে জানতে পেরেছি।

এ দিকে বিষয়টি সোমবার স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে জানার পর সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম প্রাথমিকভাবে মনি বেগমকে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত ও ত্রাণসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।

চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুম বলেন, টাকার অভাবে একজন মা তার সন্তানকে বিক্রি করে দেবেন এটা কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না। এটা একটি হৃদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শী ঘটনা। শুধু করোনা প্রাদুর্ভাবে নয়, আজীবন আমি ওই অসহায় পরিবারের পাশে থাকব ও সহযোগিতা করব ইনশাআল্লাহ।