ঢাকা, আজ সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

১৩ বছর ধরেই তারা লকডাউনে!

প্রকাশ: ২০২০-০৫-০২ ১৪:২৪:৪৩ || আপডেট: ২০২০-০৫-০২ ১৪:২৪:৪৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ‘লকডাউন’ শব্দটির সঙ্গে বিশ্ব নতুন পরিচিত হলেও এ বাস্তবতার সঙ্গে অনেক আগেই মানিয়ে নিয়েছে ফিলিস্তিনের গাজা। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে চার দেয়ালে বন্দী গাজার মানুষ ভেবেছিলো করোনাভাইরাস হয়তবা তাদের খুঁজে পাবে না। কিন্তু সেই আত্নতৃপ্তি বেশি দিন টেকেনি। করোনার মো’কাবেলায় তাদেরকেও এখন ল’ড়তে হচ্ছে হাতিয়ার ছাড়া।

জবর দখলের মধ্যদিয়ে মূলত ফিলিস্তিনকে দুইভাগে ভাগ করে রেখেছে ইসরায়েল। এর মধ্যে পশ্চিম তীরে সামান্য সুবিধা থাকলেও একঘরে করে রাখা গাজায় নেই নূন্যতম নাগরিক সুবিধা। মাত্র ৩৬৫ বর্গ কিলোমিটারে এই ভূমিতে ২০ লাখের ওপর মানুষের বসবাস। যাদের জীবন-জীবিকা বলতে কিছু নেই, ৮০ শতাংশ মানুষ নির্ভর করে সাহায্যের ওপর। ইসরায়েলের বহুমুখী অবরোধে একটি সুঁইও গাজায় ঢুকতে পারে না। এখানকার কয়েক লাখ মানুষই বাস করে শরনার্থী শিবিরে, বাকীরা নিজের বাড়িতে থাকলেও রাত কাটাতে হয় বো’মার আ’তংকে।

ফিলিস্তিনে এ পর্যন্ত ৩৫৩ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। মা’রা গেছে ২ জন। এর মধ্যে গাজায় আক্রা’ন্ত আছেন ১২ জন। এখনও পর্যন্ত কোন মৃ’ত্যু নেই। করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ল’ড়ার জন্য গাজার সম্বল মাত্র ৬৩ টি ভেন্টিলেটর এবং ৭৮ টি আইসিইউ শয্যা। গাজার যে কয়জন চিকিৎসক আছেন তারা উদ্বিগ্ন। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এ ভূখন্ডে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা ক’ঠিন। স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা নেই বললেই চলে। ফিলিস্তিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান ডা. জেরাল্ড রোকেনসেয়াব বলেন, ‘গাজায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একেবারেই দূর্বল, তেমন সুযোগ-সুবিধা নেই। তাই এ মুহুর্তে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।’

এ দিকে গাজায় ইউএসএআইডির পক্ষ থেকে সহায়তা দেয়ার কথা থাকলেও সেটি আ’টকে দেয়া হয়েছে হামাস সুবিধা পাবে এমন কারণ দেখিয়ে। তাই গাজার মানুষ করোনা থেকে বেচেঁ থাকতে নিজেরাই নিজেদের সুরক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে। মাস্ক তৈরি করছেন কেউ পাতা দিয়ে, কেউ বোতল দিয়ে, অথবা টিন ও কাপড়ের টুকরো দিয়ে । যা দৃষ্টি কেড়েছে বিশ্ববাসীরও।

ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত গাজা ইসরায়েল ও মিশর দ্বারা বেষ্টিত। সশস্ত্র বাহিনী হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর থেকেই ভূখন্ডটির উপর অবরোধ আরোপ করে ইসরায়েল। বন্ধ করে দেয়া হয় মিশর সীমান্তও। গাজার স্থল সীমান্তের পাশাপাশি আকাশ ও সমুদ্র পথ সবই বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে মানুষের যাতায়াত ও আমদানী-রপ্তানি পুরোটাই কার্যত্ অচল। ভয়াবহ দারিদ্র ও বেকারত্বের পাশাপাশি মাঝে মোঝেই ইসরায়েলি হা’মলায় পুরো গাজা একটি মৃ’ত্যু উপত্যকা।

পানি ও বিদ্যুত ছাড়াই দিনের পর দিন তাদের কা’টাতে হয়। অচল এ অঞ্চলটিকে সচল রাখতে মাটির নীচ নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ করে মাঝে মাঝে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য মিশর থেকে আনা নেয়া করে হামাস। কিন্তু ইসরায়েলি মিসাইল মাঝে মাঝে সেই সুড়ঙ্গগুলোও ধ্বং’স করে দেয়। ফলে করোনার এ দুঃস্বময়ে আল্লাহর উপর ভরসা করা ছাড়া তাদের আর কোন উপায় নেই। সূত্র: আলজাজিরা, এএফপি। এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে যখন করোনা সংক্রমণ পিক পর্যায়ে পৌঁছুবে তখন সবকিছু খুলে দেওয়া হতে পারে। আংশিকভাবে ইতিমধ্যেই অনেককিছু খুলে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা শহরের অনেক স্থানে এখন জানজট দেখা দিয়েছে। লোকজন ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছে। গার্মেন্টস কারখানাগুলো, অর্ধেক অফিস আদালতও খুলেছে। আজ কিছু কিছু পণ্যবাহী ট্রেনও চালু হলো। ধারণা করা হচ্ছে, সরকার আগামী ৬ মে’র পর আস্তে আস্তে সবকিছু খুলে দেবে। নতুন করে ছুটি দেওয়া হবে না।

সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে যে, রোজার ঈদকে ঘিরে কেনা বেচায় অর্থনীতির একটা গতিপ্রবাহ থাকে। সেটাকে মাথায় রেখে সরকার সীমিত সময়ের জন্য আস্তে আস্তে সবকিছু খুলে দেওয়ার একটা চিন্তাভাবনা করছে। বিশেষ করে সরকারী অফিস আদালত ও ভ্যাট অফিসের কার্যক্রম যেন স্বাভাবিক হয় সে লক্ষ্যেও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো এবং অন্যান্য কিছু জিনিস খুলে সরকার একটি স্বাভাবিক পরিস্থিতি আনার চেষ্টা করছে। যেন ঈদে একেবারে রুদ্ধ অর্থনীতি না হয়। সমস্ত কর্মকাণ্ড যেন স্তব্ধ না থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, সবকিছু খুলে দেওয়ার পর কি হবে?

বাংলাদেশে যে করোনার পরিস্থিতি সেই পরিস্থিতি অনুযায়ী সবকিছু খুলে দেওয়া কি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে নাকি বাংলাদেশ একটা মহামারিকে আলিঙ্গন করবে?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিশেষজ্ঞ বলছেন যে, এটা একটা খুব হিসেবের বিষয়। সবকিছু হিসেবে নিকাশ করেই সরকার পদক্ষেপ নিবে বলে আশা করা যাচ্ছে। কারণ একদিকে হলো করোনার আশঙ্কা অন্যদিকে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা। এই দুই আশঙ্কার মধ্যে কোনটা বেশি আক্রমানত্নক, কোনটি বেশি ক্ষতিকর সেই হিসেব করেই সরকার এগুচ্ছে। সেভাবেই সরকার পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে। সরকারের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ দিন যদি খোলা রাখা হয় তাহলে অর্থনীতিতে একটা গতি প্রবাহ আসবে। তারপর আপনা আপনি ঈদের ছুটিতে মে মাসের শেষদিকে বন্ধ হবে। সে সময় সরকার যদি দেখে পরিস্থিতি খারাপ তাহলে ছুটিটা বাড়িয়ে মাসের শেষ অব্দি নিয়ে যেতে পারে। কারণ সরকার আশা করছে যে, মে মাসের শেষ দিকে পরিস্থিতি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হবে। এখন যে জায়গাটিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে সেটা হলো, যখন করোনা পরিস্থিতি চুড়ান্তে পৌঁছবে তখন সবকিছু খুলে দেওয়ার পরিণামটা কি হবে?

ইতিমধ্যে গার্মেন্টসসহ রপ্তানিমুখী কারখানা, সরকারী অফিস আদালতগুলো খোলা হয়েছে। রাস্তাঘাট, বাজারে মানুষের ভিড় বেড়েছে, কাজেই এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে কি হবে? এবং খুব স্বাভাবিকভাবে বলা যায়, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এরফলে করোনার যে সামাজিক সংক্রমণ তার ব্যাপক বিস্তৃতি হবে। এই ব্যাপক বিস্তৃতি হওয়ার ফলে জনস্বাস্থের জন্য একটা হুমকি তৈরী হবে এটা অনিবার্য। কিন্তু এর বিপরীতে কোন কোন বিশেষজ্ঞ মনে করছেন যে, বাংলাদেশে করোনার যে সংক্রমণ হচ্ছে তার মাত্র ৫ ভাগ উদ্বেগজনক বা ভয়াবহ হচ্ছে, এদের নিয়েই চিন্তা। বাকি যারা সংক্রমিত হচ্ছেন তারা বাসায় ১০ থেকে ১৪ দিনে চিকিৎসা করেই সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। কাজেই এই সংক্রমণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইতালিতে যেমন হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে, তেমন পরিস্থিতি হবে না। সীমিত পরীক্ষার কারণে তেমন পরিস্থিতি হওয়ার সুযোগও নেই। কাজেই এই সবকিছু খুলে দেওয়ার পর যদি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে একটা গতি আসে এবং এই সময়ের মধ্যে যদি করোনার সংক্রমণ চলে যায় তাহলে সবকিছু স্বাভাবিক করে নিয়ে আসতে সরকারের বেশি বেগ পেতে হবে না। দ্রুতই অর্থনীতির চাকা সচল করতে পারবে বলে সরকার মনে করছে।

সরকারের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, করোনায় জনস্বাস্থ্যের যে হুমকি সেটি হলো সাময়িক। একটা সময় এসে চলে যাবে। দুই বা তিনমাসের ধাক্কা। কিন্তু অর্থনীতির বিপর্যয় দীর্ঘ। তাই এখন থেকেই সেই বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য সরকারকে প্রস্তুতি নিতে হবে। সেই কাজটিই সরকার করছে।

Share0TweetShare