ঢাকা, আজ বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১

কওমী স্বীকৃতির পেছনের চাপা পড়া ইতিহাস; আল্লামা সাঈদী যে স্বীকৃতির প্রথম উত্থাপক

প্রকাশ: ২০১৯-০৭-০৬ ০৪:৪৭:১৭ || আপডেট: ২০১৯-০৭-০৬ ০৪:৪৭:১৭

কওমী সনদের মান, এটি একটি ঐতিহাসিক দাবি। দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী এই শিক্ষা ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং সংস্কার জাতির প্রয়োজনেই অপরিহার্য ছিল।

কেউ স্বীকার করুক আর নাই করুক এই ধারণা বিতর্কের উর্ধ্বে। এই ধারণার বাইরে কারো দ্বিমতও থাকতে পারে। মান নিয়ে কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার স্বকীয়তা ধরে রাখার ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয় কিংবা কিছু প্রশ্নও থাকতে পারে। তবে কওমী আলেমগণের শুকরিয়া জানানোর ভাষা এবং পদ্ধতি দেখে এই মান এবং স্বীকৃতির অপরিহার্যতাটা যে কতটা জরুরী ছিল এটা বুঝা যায়।

যেহেতু মানের ব্যাপারটাকে কওমী আলেমগণ জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করেছেন সেহেতু যিনি এই মান দিয়েছেন তাকে মূল্যায়নের গুরুত্বও স্বাভাবিকভাবে তাদের কাছে অনেক বেশীই জরুরী হওয়ার কথা। আপাতত এ বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবেই নেয়া যাক।
কিন্তু মানুষ ইতিহাস এবং অবদানের মূল্যায়নের ব্যাপারে যদি কোনো ক্ষেত্রে বিকৃতি, অবহেলা বা অবমূল্যায়ন করেন অবশ্যই এটা আরেকটা খারাপ ইতিহাস সৃষ্টির পথ তৈরী করে দেয়। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখেই চিন্তার জগত সম্প্রসারিত করা উচিৎ সবার।প্রধানমন্ত্রী হাসিনা কওমী সনদের স্বীকৃতি দিয়েছেন, এ স্বীকৃতির ব্যাপারে সকল ব্যবস্থা নিয়েছেন, পুরো কৃতিত্বটাই এখানে তার প্রাপ্য। তিনি এক্ষেত্রে অবশ্যই বড় কাজটি করেছেন। এটা নিয়ে সবাই একমত।

সব বিতর্ক এবং সংশয়ের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দাওরায়ে হাদীস মাস্টার্সের সমমান পেল এটাই এই মুহুর্তের বিরাট অর্জন। ব্যাপারটা এখানে থেমে গেলেই ভালো হত। কিন্তু হটাত করে কিছু নিউজ এবং প্রমিনেন্ট কিছু ব্যক্তির ওয়ালে একটা বক্তব্য ভাসতে দেখলাম এরকম যে, “বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলে জামায়াতপন্থি আলেমদের বিরোধিতার কারণে কওমী সনদের স্বীকৃতি আর ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি, আজ শেখ হাসিনা স্বীকৃতি দিয়ে মূলত জামায়াত-বিএনপিকেই জবাব দিয়েছেন।” এরকম একটা বক্তব্য একটা শ্রেণী অনলাইনে ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। এটা কি আদৌ সত্য অভিযোগ কিনা আসলে, এ বিষয়ে এবার একটু পেছনে ফেরা যাক।


বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়েই মূলত এ দাবিটি জোরালো হয়। তৎকালীন জোটের শরীক ইসলামী ঐক্যজোটের প্রধান মরহুম শায়খুল হাদিস আল্লামা আজীজুল হক সাহেবের নেতৃত্বেই মূলত এ দাবির পক্ষে জোরালো অবস্থান তৈরী হয় তখন। এবং এটাকে সময়োপযোগী দাবি হিসেবে তিনি সর্বমহলে তুলে ধরতে সক্ষম হন। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অষ্টম জাতীয় সংসদের শেষের দিকের একটি অধিবেশনে ২৯ আগষ্ট ২০০৬ ইং তারিখে সর্বপ্রথম সংসদে কওমী সনদের স্বীকৃতির বিষয়ে একটি বিল উত্থাপিত হয়। এ বিলটি সংসদে দৃঢ়তার সাথে উত্থাপন করেছিলেন বিশ্ববরেণ্য মুফাসসিরে কুরআন, জননন্দিত ব্যক্তিত্ব, তৎকালীন সংসদ সদস্য আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।

সেদিন তিনি দৃঢ়তার সাথে এ বিলটির পক্ষে তার যুক্তি তুলে ধরেন। এই বিলের পরিপ্রেক্ষিতেই মূলত পরবর্তীতে দাওরায়ে হাদীসকে ইসলামিক ষ্টাডিজ এবং এ্যারাবিক লিটারেচারে গ্রাজুয়েশান সমমান এবং এই ডিগ্রীধারীদের সরকারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়া সংক্রান্ত একটি নটিফিকেশান জারি করেছিল সরকার। যেটা পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ইয়াজ উদ্দিন আহমেদের সময় ২০ ডিসেম্বর ২০০৬ ইং তারিখে এসে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে সরকারী স্বীকৃতি জায়েজ কি নাজায়েয এবং স্বীকৃতির পর কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার স্বকীয়তা থাকা না থাকার বিতর্কে এক মঞ্চে এসে দাবির কার্যকারিতা আর বের করে নিয়ে আসতে পারেননি কওমী আলেমগণ। সরকারের মেয়াদ তখন প্রায় শেষের দিকে। তখন গেজেট প্রকাশের পরও কেন এই স্বীকৃতির কার্যকারিতা বের করে নিয়ে আসতে পারেননি এ প্রশ্নের উত্তর নিশ্চই আরো গভীরভাবে জানা আছে সংশ্লিষ্ট কওমী আলেমগণের।

আজকে এই মানের পুরো কৃতিত্বটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারেরই প্রাপ্য এটা আপনি জোর গলায় বলে বেড়াচ্ছেন,কোন আপত্তি নেই…কিন্তু পেছনের সত্য ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টাও মানা যায়না । অথচ এ ব্যাপারে আন্তরিকতা এবং কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার সরকারি স্বীকৃতি আদায়ের অপরিহার্যতার দায়বদ্ধতা থেকেই আল্লামা সাঈদী এ দাবিটিকে যৌক্তিক এবং সময়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করে উত্থাপন করেছিলেন। এরপরেও নির্দিষ্ট কোন পন্থির আলেমদের বিরোধিতার এই অপপ্রচার এবং অভিযোগ আদৌ কি যৌক্তিক বলা যায়? বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এখন এ স্বীকৃতির ব্যাপারে কৃতিত্বের অধিকারী, তাকে কৃতিত্ব দেন এ ব্যাপারে সবাই একমত । কিন্তু পেছনের ইতিহাস জানাটা যেমন জরুরী, ইতিহাস জেনে সেটাকে বিকৃত করে অপপ্রচার করা থেকে দুরে থাকাটাও তেমনই জরুরী। যারা অপপ্রচার ছড়াচ্ছেন এরা তারাই, যাদের ব্যাপারে পুরো কওমী সমাজও অসন্তুষ্ট। উলামায়ে কেরামের ঐক্য এবং সংহতির প্রশ্নে তারাই মূল প্রতিবন্ধকতার দেয়াল তৈরী করে রাখেন। বিভাজন, বিকৃতির ক্ষেত্রে তারাই মূল খলনায়কের ভূমিকা পালন করেন। আশা করি এ চর্চাগুলো বন্ধ হবে। ইসলামী শক্তির ঐক্য এবং দৃঢ়তার প্রশ্নে বিতর্কিত এ পথগুলোও পরিহার হবে।

আল্লামা সাঈদীর একটি কথা এই প্রেক্ষাপটে আজকে আবারও মনে পড়ে গেল, তিনি বলেছিলেন,”কওমী এবং আলিয়া আমার দু চোখ; এক চোখ বাদ দিয়ে অন্য চোখকে যেমন আলাদা করে গুরুত্ব দেয়ার সুযোগ নেই তেমনি কওমী এবং আলিয়ার ব্যাপারেও কাউকে আলাদা করে কম-বেশী গুরুত্ব দেয়ার সুযোগ নেই।” এই কথার অন্তর্নিহিত ভাব এবং ভালোবাসা বুঝলে নিশ্চয়ই কেউ আর নির্দিষ্ট কোন পন্থির আলেম বলে কাউকে গালি দেবেন না আশা করি। অপপ্রচারও আর করবেন না।

আশা করি সব ভেদাভেদ ঘুচে যাবে একদিন। সেই প্রত্যাশাই থাকবে সবসময়।

সুত্রঃ আরটিএনএন