ঢাকা, আজ সোমবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২১

কেউ নিহত বা আহত হয়নি, কিন্তু ৯ জনের ফাঁসির আদেশ!

প্রকাশ: ২০১৯-০৭-০৬ ০৪:৩৩:১৬ || আপডেট: ২০১৯-০৭-০৬ ০৪:৩৩:১৬

পাবনায় ৯ বিএনপি নেতার ফাঁসি ও কিঞ্চিত অতীত ফিরে দেখা -১৯৯৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। শেখ হাসিনার ট্রেইন মার্চ চলছিল দেশব্যাপি। তিনি ট্রেনে চড়ে প্রতিটি স্টেশনে বক্তব্য রাখছিলেন। রাতের বেলায় ট্রেইনের বাইরে রহস্যজনক গুলি চালানো হয় পাবনার ঈশ্বদীতে। তখন বিএনপি ক্ষমতায়। পরবর্তীতে অবশ্য সেই রহস্যের জট খুলে দেন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত রহকারী মতিউর রহমান রেন্টু। তিনি ‘আমার ফাঁসি চাই’ বইয়ে লিখেছেন, সাংবাদিকসহ অন্যদের ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য গুলি করার নির্দেশ দেন। তখন সফরসঙ্গী আওয়ামী লীগ নেতা বাহাউদ্দিন নাসিম নিজের বন্দুক নিয়ে গুলি ছুড়েন। এ আওয়াজে পুলিশও কয়েক রাউন্ডি গুলি চালায়। সবাই ঘুম থেকে উঠে পড়েন গুলির আওয়াজে।

এই ঘটনায় ২৪ বছর পর ৯জনকে ফাঁসি দিয়েছে পাবনার জেলাজজ আদালত। কেউ নিহত বা আহত হওয়ার খবর নাই। কিন্তু ৯ জনের ফাঁসির আদেশ হয়ে গেল। আরো ২৫ জনের যাবজ্জীবন। সবাই বিএনপি নেতাকর্মী। সব ঘটনারই বিচার হওয়া উচিত। বিচারহীনতার রাজনীতি ভাল নয়। শেখ হাসিনা সেই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসছেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন। তিনি যা ইচ্ছা তাই করতেও পারেন। এতে কোন সমস্যা নাই। গুলির আওয়াজ যেহেতু হয়েছিল সুতরাং ফাঁসি হতেই পারে!

এবার দেখে নিতে পারি উল্টা দিকে কি ঘটেছিল। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের জুলাই পর্যন্ত ক্ষতায় ছিলেন শেখ হাসিনা। বিএনপি তখন বিরোধী দলে। ২০০০ সালের শেষ দিকে বেগম খালেদা জিয়া বরিশাল যাওয়ার জন্য রওয়ানা দিয়েছিলেন সড়ক পথে। তারিখটা এই মুহূর্তে আমার মনে নেই। আরিচায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের হামলা ও গুলি চালায়। তাঁর গাড়িবহর ঢাকা প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হয়। ঢাকায় ফিরে সিদ্ধান্ত হয় কেরানীগঞ্জ হয়ে মাওয়া দিয়ে তিনি যাবেন। রওয়ানা দেয়ার চেষ্টা করেন মাওয়া ফেরিঘাটের উদ্দেশ্যে। এখানে কেরানীগঞ্জের পরই হামলা শুরু হয়। আবারো গাড়িবহর ফেরত আসে ঢাকায়। একদিনে দুটি চেষ্টাই ব্যর্থ করে দেয় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের হামলা ও গুলি।

সবারই মনে থাকার কথা পার্বত্য চট্রগ্রাম চুক্তির বিরুদ্ধে রোড মার্চের কথা। পার্বত্য চট্রগ্রাম রওয়ানা হয়েছিল রোডমার্চ ঢাকা থেকে। নারায়নগঞ্জে চালানো হয় গুলি। অনেক গাড়ির টায়ার গুলিতে ফাঁটিয়ে দেয়া হয়। রোডমার্চ সারাদিন নারায়নগঞ্জের রাস্তায় আটকে থাকে।২০০০ সালের ঘটনা। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে হরতাল কর্মসূচি। ঢাকার রমনা এলাকার এমপি তখন এইচ বিএম ইকবাল। ইকবালের নেতৃত্বে মির্জা আব্বাসের একটি মিছিলে গুলি চালানো হয় মালিবাগে। গুলিতে ৪জন নিহত হন ঘটনাস্থলে। এই ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়েছিল। পত্রিকায় ছবি ছিল ইকবালের হাতে পিস্তল। পাশে দাড়িয়ে থাকা চিহ্নিত দুই সন্ত্রাসী তাদের পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়ছেন মির্জা আব্বাসের মিছিলের দিকে। সবই ছবিতে ভাসছিল।ঢাকা কোতয়ালী থানা বিএনপি নেতা এডভোকেট হাবিব মন্ডল। কোর্ট এলাকা এবং মহানগরে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। তাঁকে দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা।এরকম ঘটনা বলে ও লিখে শেষ করা যাবে না। রীতিমত একটি গবেষণা হতে পারে এই ঘটনা গুলো নিয়ে।

এখন কথা হচ্ছে, এর কিছুদিন পরই বিশাল বিজয় নিয়ে বিএনপি’র নেতৃত্বে চার দলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। ভোটের পরের দিন ঢাকায় পিন পতন নিরবতা ছিল। আওয়ামী লীগ এমনিতেই পালিয়ে যায়।ছোট একটা ঘটনা বলি। ভোটের দিন দুপুর বেলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের ভোট সেন্টার ছাত্রলীগ দখলে নেয়ার চেষ্টা করে। এই খবর শুনে তৎকালীন কমিশনার চৌধুরী আলম সেখানে যায়। জাতীয় প্রেসক্লাবের কাছইে কার্জন হল। সাংবাদিকরাও খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যায়। সাংবাদিকদের মধ্যে আমারও তখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। ছাত্র লীগের একটি ছেলে চৌধুরী আলমকে ভোট কেন্দ্রের সামনে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। তাঁকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। সাংবাদিকদের উপস্থিতি ঠের পেয়ে ছাত্রলীগ কিছুটা নমনীয় হয়। চৌধুরী আলম তখন বলছিলেন, রাতে ভোট গণনার পর এ গুলোর একটাকেও খুজে পাওয়া যাবে না। ঠিকই রাত ১১টার পর ছাত্র লীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হল ছেড়ে দিয়ে চলে যায়।

ফিরে আসি চার দলীয় জোট ক্ষমতায় যাওয়ার পর কি ঘটেছিল সেই দিকে। চার দলীয় জোট দোর্দন্ড প্রতাপের সাথে ৫ বছর দেশ শাসন করেছে। প্রশ্ন হতে পারে চার দলীয় জোট সরকার কি ওইসব ঘটনার তদন্ত বা বিচার করেছিল। উত্তরে বলা যায়, একটি ঘটনারও বিচার অনেক দূরে। তদন্ত পর্যন্ত হয়নি। তবে হাবিব মন্ডল হত্যা এবং লক্ষিপুর জেলা বিএনপির সেক্রেটারি হত্যার বিচার হয়েছিল নি¤œ আদালতে। উচ্চ আদালতে ৫ বছরেও বিচার শেষ করার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ২০০৭ সালের পর ওই আসামীরা সবাই দোর্দন্ড প্রতাপ নিয়ে বের হয়ে এসেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলাসহ আরো বহু ঘটনার কোন খবরই কেউ ৫ বছরে আর রাখেনি। এর একটা কারনও ছিল। এই ৫ বছর ধরে সবাই মনে করেছিলেন, কেউ আর ক্ষমতা থেকে সরাতে পারবে না। সুতরাং নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকাটাই মঙ্গল! এমন মনোভাবই দেখা যেত তখন ক্ষমতাসীনদের মাঝে। তাই, এই ঘটনা গুলোর বিচার দূরে থাক তদন্তের উদ্যোগ পর্যন্ত নিতে দেখা যায়নি।

উল্টা কি ঘটেছিল একটু দেখে নেই।নারায়নগঞ্জের শামিম ওসমানকে যারা চ্যালেঞ্জ দিয়ে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সেখানে বিএনপি’র রাজনীতি যারা করেছেন, তাদের অন্যতম হলেন, ডেভিট ও তৎকালীন ছাত্র দলের নারায়নগঞ্জ জেলা সভাপতি জাকির খান। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে নারায়নগঞ্জে বেগম খালেদা জিয়ার জনসভার মঞ্চে জাকির খানকে দেখেছি শিশাঢালা প্রাচীরের মত দাড়িয়ে আছেন। কিন্তু বিজয়ের পর ডেভিটকে ক্রসফায়ার দেয়া হল। জাকির দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে জীবন রক্ষার তাগিদে। সারা দেশ জুড়েই এরকম ঘটনা ঘটেছে। যা নিয়ে রীতিমত আরেকটি গবেষণার দাবী রাখে।

শেষ করার আগে আরেকটি ঘটনা মনে পড়ছে। জাসদ নেতা কাজি আরেফ হত্যাকান্ডের ঘটনা হয়ত: ইতোমধ্যে অনেকেই ভুলে গেছেন। নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়ত সেটা জানেনও না। ১৯৯৮ সালের ঘটনা। কুষ্টিয়ার এক জনসভায় কাজী আরেফকে মঞ্চে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হামলায় কাজি আরেফসহ ৫জন নিহন হন। একই জনসভা মঞ্চে জাসদের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক হাসানুল হক ইনুও ছিলেন। হামলার মাত্র ৫ মিনিট আগে তিনি জনসভা মঞ্চ থেকে নিমে যান। এই ঘটনার সাথে হাসাুল হক ইনু জড়িত তখনই অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
কাজী আরেফ হত্যার বিচার হয়েছে। কিছু লাল্লু পাঞ্জুকে ফাঁসিও কার্যকর করা হয়। চাল দলীয় জোট ক্ষমতায় এসেই এই বিচার করেছে। কিন্তু ঘটনার মূল হোতা হাসানুল হক ইনুকে রাখা হয় ধরাছোয়ার বাইরে।

আজ এখানে রাখি। আরো বহু ঘটনা মনে পড়বে। আপাতত এটুকু মনে আসছে। তাই লিখে দিলাম।-অলিউল্লাহ নোমানের ফেসবুক থেকে